সুস্থ’ সালাহ উদ্দিন শুধু বলছেন, আমার চোখ বাঁধা ছিল

03_222114

নিখোঁজ হওয়া থেকে উদ্ধার পর্যন্ত দুই মাস সময় কোথায় ছিলেন সে ব্যাপারে কিছুই বলছেন না ভারতের শিলংয়ে আটক অবস্থায় চিকিৎসাধীন বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদ। দুই মাস আগে ঢাকার উত্তরা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং গত ১১ মে কে বা কারা ভারতে শিলংয়ে ফেলে গেছে- এই দুই ভাষ্যের বাইরে স্থানীয় পুলিশকে কিছুই বলছেন না তিনি। শিলং পুলিশের একাধিক সূত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

নিজের অবস্থান সম্পর্কে সালাহ উদ্দিন আহমেদের এই নীরবতা ‘রহস্যজনক’ বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। কী কারণে তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না সে বিষয়টি পুলিশকে ভাবাচ্ছে। স্থানীয় পুলিশের দাবি, গত দুই মাসে যা-ই ঘটেছে তা তাঁর (সালাহ উদ্দিনের) ভুলে যাওয়ার কথা নয়। মানসিকভাবেও তিনি সুস্থ। স্ত্রীর মোবাইল নম্বরও মনে করতে পেরেছেন। তাহলে কেন তিনি নিজের ব্যাপারে বলতে পারছেন না সে প্রশ্ন শুধু রহস্যেরই জন্ম দিচ্ছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ বর্তমানে শিলং সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। পুলিশ এখনো তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেনি। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলেই তাঁকে আদালতে তোলা হবে। তারপর হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে। তবে শিলং পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু না হলেও ইতিমধ্যে তাঁরা সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলেছেন। জানতে চেয়েছেন কিভাবে তিনি শিলং এলেন কিংবা এত দিন কোথায় ছিলেন। সূত্র মতে, এ ব্যাপারে কোনো কথাই বলছেন না আটক এই বিএনপি নেতা। শুধু বলছেন, ‘সব কিছু’ তাঁর মনে নেই। তিনি বলছেন, অপহৃত হওয়ার পর থেকে তাঁর চোখ সব সময় বাঁধা ছিল, এমনকি শিলংয়ে ফেলে যাওয়ার সময়ও চোখ বাঁধা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ দুই মাস সময় তিনি কোথায়, কিভাবে কাটিয়েছেন এসবের কিছুই পুলিশকে বলেননি।

আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ না হওয়ায় এবং চিকিৎসাধীন থাকায় পুলিশও এ ব্যাপারে বেশি দূর এগোতে পারছে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সালাহ উদ্দিন আহমেদ যেকোনো কারণেই হোক সব কিছু খুলে বলতে চাচ্ছেন না। গত দুই মাস তাঁর অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন বলেও তাঁরা মনে করছেন।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে সালাহ উদ্দিন শিলং গেলেন। ঘটনাটি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে (বিএসএফ) তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিএসএফের উচ্চপর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সালাহ উদ্দিন আহমেদকে গত সোমবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকায় পাওয়া যায়। যে গাড়িতে করে এনে তাঁকে ফেলে যাওয়া হয় সেই গাড়িটি ছিল ভারতীয় মারুতি গাড়ি। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ধারণা, সারা রাত গাড়ি চালিয়ে ভোরে গলফ লিংক এলাকায় সালাহ উদ্দিনকে রেখে যাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা দুটো বিষয়কে সামনে রেখে তাঁদের অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছেন। প্রথমত সালাহ উদ্দিন আহমেদ কি আগে থেকেই মেঘালয় রাজ্যের কোথাও অবস্থান করছিলেন, নাকি ওই দিনই তাঁকে সীমান্ত অতিক্রম করে নিয়ে আসা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যদি ওই দিনই তাঁকে শিলংয়ে নিয়ে আসা হয়, তাহলে কিভাবে বিএসএফের চোখ ফাঁকি দিয়ে এটা সম্ভব হলো। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গলদঘর্ম হচ্ছে পুলিশ।

বাংলাদেশ থেকে সড়কপথে শিলং যাওয়ার স্বাভাবিক রুট হচ্ছে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত। ওপারে ভারতের ডাউকি বাজার। সেখান থেকে শিলংয়ের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। তবে ভারতের করিমগঞ্জ হয়েও সড়কপথে শিলং যাওয়া যায়। তবে সেই পথ অনেক দীর্ঘ। প্রায় ২৩০ কিলোমিটার এবং ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে কুশিয়ারা নদী পার হয়ে এবং সুতারকান্দি স্থলবন্দর দিয়ে হেঁটে করিমগঞ্জ যাওয়া যায়।

সালাহ উদ্দিন আহমেদকে শিলংয়ে পাওয়ার ঘটনায় বিএসএফের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। এই সীমান্ত সুরক্ষায় বিএসএফের ৯টি কম্পানি দায়িত্ব পালন করছে। এত তীক্ষ্ন নজরদারির মধ্যে সালাহ উদ্দিন আহমেদ কিভাবে ভারতে ঢুকলেন- এ নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিএসএফের মুখপাত্র এস কে সিং। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দেখা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলেই সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আদালতে সোপর্দ করবে পুলিশ। ইতিমধ্যে সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এগুলোর রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিলং সিভিল হাসপাতালের চিকিৎসক ডি জে গোস্বামী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমেদ কিডনি এবং কার্ডিয়াক সমস্যার কথা বলেছেন। তবে আমরা তাঁর ইসিজি করেছি। ইসিজি রিপোর্ট স্বাভাবিক রয়েছে। আর কিডনি সমস্যার ব্যাপারে আমরা একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের সঙ্গে কথা বলছি। ‘

শিলংয়ের ইস্ট খাসি হিল জেলার পুলিশ সুপার এম খারক্রাং আবারও বলেছেন, ‘চিকিৎসাধীন থাকায় সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আদালতে সোপর্দ করা যাচ্ছে না।’ হাসপাতালের ছাড়পত্র পাওয়া মাত্রই তাঁকে আদালতে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে হয়তো হাসপাতাল থেকে সালাহ উদ্দিন ছাড়া পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


*

x

Check Also

dss74

প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে’

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমানে দেশে জনগণের না আছে নাগরিক স্বাধীনতা না আছে মৌলিক অধিকার। সুতরাং এ নৈরাজ্যকর দুঃশাসনের ছোবল থেকে মুক্তি পেতে এ মুহূর্তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তায় জনগণের মিলিত কণ্ঠে আওয়াজ তুলে বর্তমান অপশাসনের অবসান ঘটাতে হবে। আগামীকাল রবিবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষ্যে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বেগম জিয়া এসব বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন ভয়াবহ দুঃসময় চলছে। এদেশে শুধু বিরোধীদলের নেতাকর্মীরাই শুধু নয়, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, নারী, শিশুসহ কারোই কোনো নিরাপত্তা নেই। এদের অধিকাংশই গুম, গুপ্ত হত্যা এবং বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন। ...

image-60750

ভাঙল বিএনপির আরেক শরিক

আবার ভাঙল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের একটি শরিক দল। জমিয়তে উলামায় ইসলাম নামের দলটির নির্বাহী সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুফতি ওয়াক্কাছের নির্বাহী সদস্যপদ স্থগিত করেছে দলের একটি পক্ষ। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সুরক্ষা কমিটি নামে অসাংবিধানিক কমিটি করার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছেন ওয়াক্কাসকে বহিস্কার করা নেতারা। শনিবার দলের আমেলা (নির্বাহী) সদস্যদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মূফতি ওয়াক্কাসের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এরমধ্য দিয়ে ভাঙন শুরু হল দলটির। যদিও ওয়াক্কাস অংশের নেতারা এমন সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক দাবি করছেন। তারা বলছেন, যে বৈঠকের কথা বলা হচ্ছে সেখানে ২৬ জনের মত উপস্থিত ছিলেন। অথচ দলের আমেলা (নির্বাহী) সদস্য ...

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com