হারিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুরা

 

RohingyaChildren54__1000x665

সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তখনও টেকনাফের উনছিপ্রাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর ত্রাণ ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘ সারি। হাজার হাজার মানুষের এ দীর্ঘ সারিতে বড় বোনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ৭ বছরের শিশু আজহার। বড় বোন হালিমা (১০) শক্ত করে ধরে রেখেছে আদরের ছোট ভাইকে। তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কাছে গিয়ে কথা বলতে গেলেই হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করেন।

এরপর তারা বলতে থাকেন, আমাদের এখান থেকে নিয়ে যান। খুব কষ্টে আছি। মিয়ানমার থেকে বাবার হাত ধরে বাংলাদেশে এসে বাবাকে হারিয়ে ফেলেছি। বাবা এখন কোথায় আছেন জানি না। মাকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। বাবা-হারা আজহার ও হালিমা এখন আশ্রয় নিয়েছেন পুথিন পাহাড় আশ্রয় শিবিরে। ছোট ভাইটিকে নিয়ে হালিমা এখন দিশেহারা। মিয়ানমার সেনাবাহিনী আগুনে পুড়ে মেরেছে অবুঝ তিন সন্তানকে। আর বেঁচে থাকা দুই সন্তানটাকে নিয়ে এপারে পালিয়ে এসে মায়ের হাতের মুঠোই থেকে হারিয়ে গেল দুই কন্যা সন্তান।

শুক্রবার সকালে সন্তান দুইটি হারিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে আশ্রয় খুঁজেও জায়গা মিলে না সায়েদা খাতুনের। সায়েদা খাতুনের ৫ সন্তান মো. আলম ৮, মো. হাসিম ৫, মনির আলম ৪, দিলসাদ বেগম ৬ ও ছলিমা বেগম ৩। বাড়ি মংডুর শিলখালী গ্রামের জামাল ছিদ্দিকের স্ত্রী। জামাল সেনাবাহিনীর হামলার পর পালিয়ে গিয়ে আর ফেরেননি।

সায়েদা খাতুন বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে আক্রমণ করে গত সোমবার রাতে। শুক্রবার ভোরে নাফ নদ পার হয়ে ২০ মিয়ানমার নাগরিক শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেন। পরে সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী স্কুলের সামনে থেকে ট্রাকে করে টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছেন। এরপর যে ট্রাকে করে এসেছেন সেখানে বুকের ধনদের না দেখে সাথে সাথে চিৎকার করতে থাকে। অনেক খোজাখুজি করে পেলেন না দুই সন্তানকে।

সায়েদা খাতুন বলেন, ওপারে তিন সন্তানকে হত্যা করেছে সেনারা। এপারে এসে দুই সন্তানকে হারালাম। আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। এখন আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকব? স্বামীও বেঁচে আছে কিনা জানি না। হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের কিভাবে ফিরে পাব জানি না। নির্যাতনের শিকার হয়ে চার সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন মো. ইব্ররাহীম ৪৫। তার বাড়ি মিয়ানমার গদুরছড়া গ্রামে।

তিনি জানান, স্ত্রী জুহুরার লাশ ফেলে গত বুধবার ভোরে নাফ নদ পার হয়ে চার সন্তানদের নিয়ে এপারে চলে আসেন। তার সঙ্গে ছিল কলিমা ১৬, রোজিনা আক্তার ১৪, ছমিরা বেগম ১০ ও মো. ওলি হোসেন ৮। তারা ওই সকাল ৮টায় শাহপরীর দ্বীপ থেকে নৌকা করে হারিয়াখালী ভাঙ্গার মাথা পৌঁছেন। নৌকার থেকে ওঠার পর জানতে পারেন তার একমাত্র সন্তান ওলি হোসেন নেই।

তিনি সন্তানদের এপারে রেখে ওপারে ছেলেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে সন্ধায় হারিয়াখালী স্কুলে আশ্রয় নেন। পরেদিনও ছেলের খোঁজে এদিক-ওদিক ছুটেও পায়নি একমাত্র ছেলে সন্তান ওলিকে। পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সাথে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় দুই লাখ শিশু। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে অনেকেই হারিয়ে ফেলছেন প্রিয় শিশুসন্তানকে। সন্তানহারা বাবা-মা আর তাদের ঠিকানা না জানা শিশুরা সময় পার করছে চোখের জলে।

টেকনাফ লেদা অনবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা মো. রশিদ বলেন, রোহিঙ্গাদের এতো চাপ কে কোথায় যাচ্ছে খোঁজ রাখা খুবই মুশকিল। আমি বাংলাদেশে এসেছি ১২ বছর পার হয়ে গেলে। শুক্রবার সকালে আমার দুই সন্তানও হারিয়ে যায় আবার অনেক খোজাখুজির পর প্রধান রাস্তার পাশে পেয়েছি।

তিনি বলেন, নতুন অনুপ্রবেশকারি অনেক রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ তাদের সন্তানদের হারিয়ে ফেলেছে। এ পর্যন্ত আমারা খোঁজাখুঁজি করে হারিয়ে যাওয়া ১০ পরিবার তাদের সন্তান ফিরে পেয়েছে।

এদিকে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের আবারও নিজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করতে টেকনাফে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বুথ চালু করেছে কামাল নামের একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী। একটি মঞ্চ বানিয়ে তিনি নিখোঁজদের বিষয়ে মাইকিং করছেন। লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড-এর সাহায্যে এ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া কয়েকশ শিশুকে নিজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন কামাল।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, তার ইউনিয়ন শুক্রবার ভোর ও সকালে কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে ৩ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। নাফ নদ উত্তাল থাকলেও মিয়ানমারে সেনাদের অভিযানের মুখে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। তাদের মুখে একই গল্প, মিয়ানমার সামরিক জান্তার ভয়াবহতার কথা। এ

দিকে ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ৩০টি পুলিশ ও সেনা চৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত ৫শ’র বেশি মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

এই শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার বার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতেও তারা রাজি নয়। রোহিঙ্গাদের এই স্রোত ঠেকাতে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মতো কোনো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে একাধিক নিরাপদ এলাকা সেইফ জোন গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ।

এছাড়া সীমান্তে যৌথ টহলেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবেই মিয়ানমারের সাড়া মেলেনি। উল্টো তাদের অভিযান সঠিক বলে দাবী করে বিবৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকা- শুরু করে।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


*

x

Check Also

dss74

প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে’

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমানে দেশে জনগণের না আছে নাগরিক স্বাধীনতা না আছে মৌলিক অধিকার। সুতরাং এ নৈরাজ্যকর দুঃশাসনের ছোবল থেকে মুক্তি পেতে এ মুহূর্তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তায় জনগণের মিলিত কণ্ঠে আওয়াজ তুলে বর্তমান অপশাসনের অবসান ঘটাতে হবে। আগামীকাল রবিবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষ্যে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বেগম জিয়া এসব বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন ভয়াবহ দুঃসময় চলছে। এদেশে শুধু বিরোধীদলের নেতাকর্মীরাই শুধু নয়, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, নারী, শিশুসহ কারোই কোনো নিরাপত্তা নেই। এদের অধিকাংশই গুম, গুপ্ত হত্যা এবং বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন। ...

image-60750

ভাঙল বিএনপির আরেক শরিক

আবার ভাঙল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের একটি শরিক দল। জমিয়তে উলামায় ইসলাম নামের দলটির নির্বাহী সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুফতি ওয়াক্কাছের নির্বাহী সদস্যপদ স্থগিত করেছে দলের একটি পক্ষ। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সুরক্ষা কমিটি নামে অসাংবিধানিক কমিটি করার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছেন ওয়াক্কাসকে বহিস্কার করা নেতারা। শনিবার দলের আমেলা (নির্বাহী) সদস্যদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মূফতি ওয়াক্কাসের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এরমধ্য দিয়ে ভাঙন শুরু হল দলটির। যদিও ওয়াক্কাস অংশের নেতারা এমন সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক দাবি করছেন। তারা বলছেন, যে বৈঠকের কথা বলা হচ্ছে সেখানে ২৬ জনের মত উপস্থিত ছিলেন। অথচ দলের আমেলা (নির্বাহী) সদস্য ...

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com