বৈশাখের টানা বৃষ্টিতে নাকাল নগরবাসী

image_1879_288082

শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকাল পর্যন্ত থেমে থেমে বৈশাখের মুষলধারার বৃষ্টিতে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নগরজুড়ে সৃষ্ট যানজটে দিনভর নাকাল হয়েছে রাজধানীবাসী। পথঘাটের ভোগান্তি পেরিয়ে কর্মজীবী মানুষ নির্ধারিত সময় অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানায় পেঁৗছতে না পারায় সেখানকার কর্মচাঞ্চল্যেও অনেকটাই ভাটা পড়ে। এমনকি জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন কাজকর্মেও নেমে আসে স্থবিরতা। পরিবহন সংকটসহ নানা ধরনের ভোগান্তির ভয়ে বিভিন্ন পেশার বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ দিনভর স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থেকেছেন।
তবে এ স্থবিরতার মাঝেও দিনভর রাজধানীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই ভয়াবহ যানজট লেগেই থেকেছে। এমনকি দুপুরের অফ-পিক আওয়ারেও পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও দেখা গেছে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের দীর্ঘ সারি। যানজটের ফাঁদে পড়ে নির্ধারিত সময় কর্মস্থলে পেঁৗছাতে না পারার ভয়ে অনেকেই রাস্তায় জমে থাকা ময়লা পানি-কাঁদা মাড়িয়েই গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটে গেছেন।

এ ছাড়া রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, মগবাজার, মৌচাক, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, শান্তিনগর, গ্রীনরোড, খিলগাঁও, বনশ্রী, গোড়ান, মাদারটেক, মাতুয়াইল, ডেমরা, দনিয়া, শ্যামপুর, জুরাইন, বাসাবো, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, শেওড়াপাড়া, কল্যাণপুর ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বিপুলসংখ্যক রাস্তায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
ঢাকা আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশ এলাকায় অবস্থানের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। শনিবার সকাল থেকে ঢাকার আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘের ঘনঘটা বাড়তে থাকে। সাড়ে সাতটার দিকে পুরো আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। সকালেই নেমে আসে রাতের আবহ। এরপর শুরু হয় বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে বৃষ্টি। আর তাতেই দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ। বিশেষ করে গণপরিবহনের সংখ্যা কম ও সড়কজুড়ে উন্নয়ন কাজের খোঁড়া গর্তের কারণে দুর্ভোগের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
মৌচাকে সড়কে জমে থাকা পানির কারণে চরম দুর্ভোগে পরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৃষ্টির পর সড়কে দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাননি অনেকে। আর যেখানে পানি জমেছে, সেখানে রিকশা ছাড়া অন্য কোনো পরিবহনের দেখা মেলেনি। আর এ সুযোগে দ্বিগুণ ভাড়া হেঁকেছেন রিকশাচালকরা। ৫ থেকে ১০ টাকা নিয়ে রাস্তা পার করেছেন তারা।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বভাসে বলা হয়েছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশ এলাকায় অবস্থান করছে। এ কারণে রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টা অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বর্জ্যসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির ফলে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় দুই মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
দুপুরের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও হাঁটু পানি, আবার কোথাও ড্রেনের পানি উপচে রাস্তায় এসে পড়েছে। এসব এড়িয়ে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও যানজট সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলামোটর থেকে কাকরাইল পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নির্মাণ সমগ্রী যত্রতত্র পড়ে থাকায় এবং সেখানকার রাস্তা মারাত্মকভাবে ভাঙাচোরা হওয়ায় এ সড়কটুকুতেই দিনভর মারাত্মক যানজট লেগেই থেকেছে। রাজধানীর ফার্মগেট, কাওরানবাজার, শাহবাগ, মৎস্য ভবন, পুরানা পল্টন, গুলিস্তান সড়কে কিছু সময় পরপরই যানজট লেগেছে। যার প্রভাব পরে নয়াপল্টন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে যানজটের কারণে দুপুরের পর থেকে নগরীতে দেখা দেয় ভয়াবহ যানবাহন সংকট। বেলা ১টার দিকে ফার্মগেট এলাকায় দেখা যায় বৃষ্টির মধ্যেই শত মানুষ গণপরিবহনে ওঠার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এদের কেউ কেউ আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাসে উঠতে পারেননি। উত্তরা, মহাখালী থেকে গাড়িগুলো আসতেই বাস স্টপেজে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাহবাগ এলাকায় দেখা যায়, মৎস্য ভবন থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে শাহবাগ শিশুপার্ক পর্যন্ত শ’ শ’ গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে। কখনও তা একটু এগিয়েই আবার থেমে যাচ্ছে। ত্যক্ত-বিরক্ত যাত্রী ও গাড়ির স্টাফদের অনেকেই জানান, এই সিগন্যাল পার হতে আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগছে। পুরানা পল্টন মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, গুলিস্তান ও মতিঝিল অভিমুখী গাড়িগুলো যেন আর এগোয় না। গাড়ির সারি চলে আসে প্রেসক্লাবের অপর পাশের সড়ক হয়ে হাইকোর্টের সামনের সড়ক পর্যন্ত।
এদিকে দুপুরের পর থেকে দিনভর রামপুরা-কুড়িল বিশ্বরোডে যানজট লেগেই থেকেছে। এ রুটের অধিকাংশ গাড়িই নির্ধারিত ট্রিপ দিতে পারেনি। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, সাধারণ দিনে যে রাস্তা পার হতে তাদের আধাঘণ্টা লাগে, শনিবার যানজটের কারণে সে রাস্তা দেড় ঘণ্টাতেও পার হওয়া যায়নি। এছাড়াও বৃষ্টির কারণে সব যাত্রী হুড়োহুড়ি করে বাসে চড়তে পারেনি। ফলে পরিবহন মালিকরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে যাত্রীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
মালিবাগ এলাকার একাধিক ট্রাফিক পুলিশ যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের গলদঘর্ম অবস্থার কথা জানিয়ে এ জন্য বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করেন। তবে পরিবহন শ্রমিকদের অনেকেই এ জন্য দূষেছেন ট্রাফিক পুলিশকেই। তাদের ভাষ্য, বৃষ্টি হলেই তারা ডিউটি ফেলে ট্রাফিক পুলিশ বক্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। আর এ সুযোগে পরিবহন চালকরা এলোপাতাড়ি গাড়ি চালিয়ে যানজট সৃষ্টি করেন।
বেলা ১২টার দিকে মুষলধারার বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শান্তিনগর, কাকরাইল, কাওরানবাজার, মগবাজার, মৌচাক, শেওড়াপাড়া, সিদ্ধেশ্বরী, বেইলি রোড, রাজারবাগ, মানিকনগর, খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া, শেরাটন মোড়, মৎস্য ভবন মোড়, শাহবাগ চত্বর, সয়েন্সল্যাবরেটরি, ফার্মগেট, মিন্টো রোড, বাংলামোটর, মহখালী, সার্ক ফোয়ারা মোড়, তেজকুনিপাড়া, বেগুনবাড়ির ঢাল, বনশ্রী, মিরপুর, উত্তরা ও পুরান ঢাকার অধিকাংশ রাস্তার পানি জমে আছে। এসব রাস্তায় বিপুল সংখ্যক সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, হিউম্যান হলার ও ট্যাক্সিক্যাব অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও খোলা ম্যানহোল ও বড় খানাখন্দে পড়ে বেশকিছু যান উল্টে পড়েছে।
রাজধানীর মৌচাক, নাহার প্লাজা, মালিবাগ ও খিলগাঁও তালতলাসহ বেশকিছু মার্কেটের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। এছাড়াও কাকরাইলের কর্ণফুলি গার্ডেন সিটি, রাজারবাগের ইষ্টার্ণ প্লাস, শান্তিনগরের টুইন টাওয়ার, গাউছিয়ার চাঁদনী চক ও ইষ্টার্ণ মলি্লকাসহ অধিকাংশ মার্কেট-শপিংমলের সামনের রাস্তা জলমগ্ন থাকায় দিনভর ক্রেতাসাধারণের দেখা মেলেনি। নগরীর অধিকাংশ সড়কের ফুটপাত বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাওয়ায় ভাসমান হকারদের ব্যবসাও ছিঁকেয় উঠে।
রায়েরবাজার থেকে মহাখালী আসার পথে ধানম-ি ২৭ নম্বর সড়কের মাঝামাঝি থেকে মিরপুর রোডের সংযোগস্থল পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির পানি কোমর ছাড়িয়ে যায়।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


*

x

Check Also

পর্যাপ্ত ফল ও সবজি না খেলে যা হয়

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত পুষ্টি, ভিটামিন ও মিনারেল দরকার। আপনার যদি চলাফেরা করা বা কাজ করার মতো শক্তি না থাকে তাহলে আপনি সুস্থভাবে বেঁচে থাকবেন কী করে। এজন্য চাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূল ও সবজি খাওয়া। আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বাইরের তৈলাক্ত খাবার বা জাঙ্ক ফুড খেতে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে হবে না যে, তাজা ফল ও সবজির কি পরিমাণ দরকার আমাদের শরীরের জন্য। অপর্যাপ্ত ফল বা সবজি খেলে অনেক শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আসুন জেনে নিই সেই সমস্যাগুলো সম্পর্কে। ভিটামিনের অভাবঃ পর্যাপ্ত পরিমাণে শাক সবজি এবং ফলমূল না খেলে আপনার শরীরে ভিটামিনের অভাব থেকে যেতে ...

cloves-benefits

আপনার মুখে দুর্গন্ধ? লবঙ্গ দিয়ে মাত্র ১০ মিনিটে দূর করুন মুখের দুর্গন্ধ

লবঙ্গকে আমরা কেবল মসলা হিসাবেই চিনি, এর হরেক রকম গুণের কথা সম্পর্কে অনেকেরই ঠিকঠাক মত জানা নেই। অবশ্য আমাদের দেশের বাজার ভরে গেছে নকল লবঙ্গ দিয়ে। লবঙ্গ থেকে আর নির্যাস বের করে কেবল গুনহীন খোসাটুকু মশলা হিসাবে বাজারে বিক্রি হয় আজকাল যা আপনার জন্য মোটেও উপকারী নয়। আসল লবঙ্গ চিনে নেয়ার রয়েছে কিছু উপায়, একই সাথে এই আসল লবঙ্গের রয়েছে দারুণ সব উপকারিতা ও ব্যবহার। চলুন, জেনে নিই জাদুকরী এই মশলার গুণের কথা। ১. দাঁত ব্যথা করছে? কয়েকটি লবং থেঁতো করে আক্রান্ত স্থানে দিয়ে রাখুন, দাঁত ব্যথার নিশ্চিত উপশম হবে। লক্ষ্য করলেই দেখবেন, বেশিরভাগ টুথপেস্টই লবঙ্গ থাকার দাবী করে। ঠিক ...

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com