শরিয়া ব্যাংকিং আদৌ কতটা ইসলামিক?

শরিয়া ব্যাংকিং আদৌ কতটা ইসলামিক?

মানব চরিত্রে স্ব-বিরোধিতা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত গল্প উপন্যাসে যেভাবে তুলে ধরা হয় বাস্তবে তার চেয়ে অল্প নয়, বেশিই দেখা যায়। চারিত্রিক এই দ্বন্দ্বটা গল্পে যতটা নজর কাড়ে বাস্তবে তারচেয়েও বেশি আমাদের দৃষ্টি এড়ায়।

একজন স্থূল দেহের ডায়েবেটিক আক্রান্ত মানুষ স্বাস্থ্য সচেতনতা থেকে সাধারণ কোক পান করেন না, যে কোনো মূল্যে ডায়েট কোক তার চাই অথচ তা তিনি পান করেন কাচ্চি বিরিয়ানি বা পোলাও, গোমাংসের হরেক রকম সুস্বাদু খাবারের সাথে ফিরনি- জর্দা দিয়ে ভূরি ভোজনের পর।

একজন ঘুষখোর, বা অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনকারিকেও তার নিজের চরিত্রের সাথে সঙ্ঘাতে লিপ্ত হতে দেখা যায় জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ গচ্ছিত রাখতে সুদমুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোঁজার বেলায়।

উপরোক্ত উদাহরণ থেকে ধরে নেয়ার কোনো অবকাশ নেই যে সকল অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীই সুদমুক্ত আমানতে আগ্রহী অথবা সুদমুক্ত আমানত প্রদানকারী সকলেই অবৈধ উপার্জনের সাথে জড়িত। এর বাইরেও বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ আছেন যারা কষ্ট ও বৈধ পথে উপার্জিত অর্থ বা নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্যকে ধর্মীয় অনুশাসনে অবশ্য বর্জনীয় সুদ থেকে দূরে রাখতেই ইসলামি ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী।

‘অ্যান আইডিয়া ক্যান চেঞ্জ ইউর লাইফ’ শ্লোগানটির যথার্থতা কতটুকু তা দেখতে আমরা একটু দৃষ্টি দিতে পারি মালটি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ও দেশে দেশে খুদ্র ঋণের ধারনার দিকে। লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে পণ্য বিক্রির এমন ব্যাবসার প্রবর্তকরা কতটুকু লাভবান হয়েছেন আর যাদের জীবন মান পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ এর গ্রাহক কতটুকু সুফল ভোগ করেছেন তা নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ আছে।

সুদমুক্ত ব্যাংকিং। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে লোভনীয় অফারতো বটেই। মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক বাজারে সহজ প্রবেশ ও ধীরে ধীরে দখলে নেয়ার অতুলনীয় ধারণাই হচ্ছে ইসলামি ব্যাংকিং। প্রথমে মালয়েশিয়ায় শুরু হওয়া এই শরিয়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে অনেক শক্তিশালি হয়েছে। পেয়েছে জনপ্রিয়তা। মূলধারার ব্যাংকের সাথে পাল্লা দিয়ে হচ্ছে এর প্রবৃদ্ধি। ওআইসিভূক্ত দেশগুলোতেও ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।

যদিও এদেশের শাসন ব্যবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতায় শরিয়া ব্যাংকিং কতটা সামঞ্জস্যপুর্ণ তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। এ বিষয়ে আলোকপাত না করে এদেশে কতটা কার্যকরভাবে ইসলামি ব্যাংকিং হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কি না সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার সময় এসেছে।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে ইসলামিক ব্যাংকিং এর যাত্রা শুরু হয় ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর মাধমে। আলোচিত- সমালোচিত এ ব্যাংকটি যুদ্ধাপরাধি সংগঠন জামায়াতে ইসলামির আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে আল আরাফা ইসলামি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। সারাদেশে এই ব্যাঙ্কগুলোর শত শত ব্রাঞ্চ আছে এবং তারা শক্তিশালি আর্থিক ভিত্তির উপর ইতোমধ্যেই দাঁড়িয়ে গেছে।

কাউকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রদান করে এর বিপরীতে নির্দিষ্ট মুনাফা গ্রহণ করাকেই ইসলামে সুদ বলা হয়। ইসলাম ধর্মে সুদকে বর্জনীয় (হারাম) এবং ব্যবসাকে গ্রহণীয় (হালাল) করা হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে, মূলধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত রেখে নির্দিষ্ট হারে সুদ নেয়া ও ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান অবশ্য বর্জনীয়।

তাই ধর্মপ্রাণ মানুষের একটা বড় অংশ যখন ইসলামি ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছিল তখন মূলধারার প্রায় সকল ব্যাঙ্কই বাজার হারানোর আশঙ্কায় ইসলামি ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ খুলেছে।

ইসলামি ব্যাংকগুলো বা মূলধারার ব্যাংক যারা ইসলামি ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ করে ব্যবসা করছে তারা তাদের আমানতকারিকে ব্যবসায়িক অংশিদার হিসেবে গ্রহণ করেই আমানত সংগ্রহ করে বলে দাবি করে। আমানতকারী থেকে নেয়া মুলধন বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তার লভ্যাংশই আমানতকারিকে দেয়া হয় বলে ব্যাংকের বিপণন কর্মকর্তারা জানান। কিন্তু তারা ছোট একটি প্রশ্নের উত্তর কখনোই দিতে পারেন না বা দিতে চান না।

সহজ এ প্রশ্নটি হচ্ছে, যদি ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত প্রকল্প লোকসানি হয়ে মূলধন হারায় এ লোকসানের ভাগীদারও আমানতকারিকে হতে হবে। কোনো একটি ইসলামি ব্যাংকে আমানত রেখে কেউ কি লোকসানের ভাগীদার হয়েছেন, এমন উদাহরণ আছে? এর উত্তরে তারা কেবল তাদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফিরিস্তি দিয়ে বিনিয়োগকৃত প্রকল্পে লোকসানের কোনো সুযোগ নেই দাবিতে অটল থাকেন।

ইসলামি ব্যাংকিং এ মুশারেকা নামে একটি বিনিয়োগ স্কিম চালু আছে। এটি আসলেই একটি ইউনিক যৌথ বিনিয়োগ। এই ধারণা কার্যকরভাবে চালু করতে পারলে ধারণার প্রবর্তক শুধু নয় গ্রাহকেরও ভাগ্য বদল সম্ভব বলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

মোশারেকার মূল মন্ত্র হচ্ছে, উদ্যোক্তা এবং ব্যাংক যৌথভাবে বিনিয়োগ করবে। ব্যাংক ও গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক ও বিশ্বাস হবে এ বিনিয়োগের ভিত্তি, কোনো মর্টগেজ বা জামানতের প্রয়োজনীয়তা নেই। ব্যবস্থাপনায় থাকবে দু’পক্ষ। মুনাফা ভাগ হবে বিনিয়োগের আনুপাতিক হারে।

এই একটি ধারণাই পুরোপুরি শরিয়া ব্যাংকিং এর প্রতিনিধিত্ব করে। বাকি মুদারাবা, বা মুরাহাবার মত স্কিমগুলো অনেকটাই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মত। যাতে নামের ভিন্নতা আর কাগুজে পার্থক্য ছাড়া তেমন ব্যতিক্রমি কিছু নয় বলে মূলধারার ব্যাংকাররা বলছেন। তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর দেশব্যাপি শত শত এবং মূলধারার ব্যাংকগুলোর অসংখ্য ইসলামি ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ থাকার পরও সারাদেশে মোশারেকার মত ক’টা বিনিয়োগ খোঁজে পাওয়া যাবে?

মোশারেকার মত জটিল বিনিয়োগে ঝক্কি- ঝামেলা ও ঝুঁকি আছে। দুনিয়া জুড়ে কাগজের চালাচালি করে যেখানে ব্যাংক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে সেখানে ইসলামি ব্যাংকগুলোও মোশারেকার মত ঝামেলা ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে তেমন আগ্রহী নয়। তাদের আগ্রহ এক্সপোর্ট ডকুমেন্ট কিনতে।

নেগোসিয়েটেড ও একসেপ্টেড বিলের বিপরীতে স্বল্পকালিন নিরাপদ ঋণ ব্যাংকের ভাষায় যাকে আইবিপি বা এলডিবিপি বলা হয়। প্রচলিত হারের চেয়ে এতে বেশি সুদও নিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক মুনাফার নাম দিয়ে যা ইসলামি শরিয়া ব্যাংকিংএ কতটা গ্রহণযোগ্য এই প্রশ্ন অবান্তর নয়। এখানেও স্ববিরোধীতা ও চরিত্রের সংঘাত লক্ষ্যণীয়।

ইসলামি ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তা, কর্মকর্তারা যে সবাই ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন এমন কোনো শর্ত নেই। প্রায় সকল ব্যাংকে শরিয়া বোর্ড রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, আলেম-ওলামা সমন্বয়ে গঠিত শরিয়া বোর্ডই শরিয়া ব্যাংকিং এর গাইডলাইন তৈরি করে দিচ্ছেন।

অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই যে মুফতি মাওলানারা সঠিক গাইড লাইনই দিচ্ছেন। হয়তো নানা সীমাবদ্ধতা ও সহজ মোনাফার আশায় ব্যাংকগুলোও তা মানতে পারছে না। সরল বিশ্বাসে ধর্মপ্রাণ মানুষ সুদমুক্ত লেনদেনের যে গুরুদায়িত্ব ব্যাংকগুলোকে দিয়েছে তা তারা সঠিকভাবে পালন করতে না পারলে ধর্মের নামে প্রতারণার দায় কি এড়ানো যাবে?

জসীম আহমেদ : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা।
josim1972@gmail.com

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


*

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com