অলিম্পিকে এতো প্রত্যাশা আমাদের মানায় না!

অলিম্পিকে এতো প্রত্যাশা আমাদের মানায় না!

গত কয়েকদিন ধরেই কিছু ‘ক্রীড়াপ্রেমী’ সরব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। বাকি-মেজবাহ থেকে শুরু করে শ্যামলী-সিদ্দিকুর সবাইকেই তুলোধুনো করে ছাড়ছেন তারা। প্রতিবার সেই একই ব্যর্থতার গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত সবাই। নিছক অংশগ্রহণই যেন বাংলাদেশের অলিম্পিক অর্জন।

রিও অলিম্পিক শেষ হতে আরো কয়েকদিন বাকি। কিন্তু লাল-সবুজদের ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ শেষ! যেখানে এবারো সেই অগ্রজদের মতো ব্যর্থতার চোরাগলি ধরেই হেঁটেছেন অংশ নেওয়া ৭ বাংলাদেশি প্রতিযোগী। তাইতো প্রশ্ন উঠেছে- কতদিন আর অলিম্পিকের সেই শতবর্ষীয় পুরনো মন্ত্র ‘হার কিংবা জিত বড় নয়, অংশগ্রহণই বড় কথা’য় আটকে থাকব? কেন ১৭ কোটি মানুষের দেশ শুধু অভিজ্ঞতা অর্জনেই শেষ করবে অলিম্পিক মিশন? ১৯৮৪ থেকে ২০১৬- আর কতদিন গেলে বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশটি পদকের দেখা পাবে?

সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে চলুন একনজরে রিও অলিম্পিকে বাংলাদেশি প্রতিযোগীদের নৈপুণ্যে চোখ রাখি-

শ্যামলী রায় : আর্চারিতে র‌্যাঙ্কিং রাউন্ডে ৭২০-এর মধ্যে ৬০০ স্কোর গড়েন। ৬৪ জনের মধ্যে ৫৩তম হয়ে বিদায়।

আবদুল্লাহ হেল বাকি : শুটিংয়ে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ৬২১.২ স্কোর করে বাছাই পর্ব থেকেই বিদায়। ৫০ জনের মধ্যে ২৫তম।

মাহফিজুর রহমান সাগর : ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে ২৩.৯২ সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করেন। হিটে আটজনের মধ্যে পঞ্চম। সব মিলিয়ে ৮৫ জনের মধ্যে ৫৪তম।

সোনিয়া আক্তার : ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে ২৯.৯৯ সেকেন্ড সময় নেন। হিটে আট প্রতিযোগীর মধ্যে তৃতীয়। সব মিলিয়ে ৮৮ জনের মধ্যে ৬৯তম।

সিদ্দিকুর রহমান : রীতিমতো ইতিহাস গড়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন অলিম্পিকে। বাংলাদেশের প্রথম কোনো অলিম্পিয়ান যিনি কি না সরাসরি খেলার ছাড়পত্র পেয়েছেন। তাইতো তাকে ঘিরে প্রত্যাশাটাও ছিল বেশি। কিন্তু পর্বতের মুসিক প্রসবের মতো যারপরনাই ব্যর্থ এই গলফারও। ৬০ জনের মধ্যে হয়েছেন ৫৮তম!

শিরিন আক্তার : ১০০ মিটার স্প্রিন্টের প্রাক-বাছাইয়ে ১২.৯৯ সেকেন্ড নিয়ে ৮ জনের মধ্যে পঞ্চম। সব মিলিয়ে বাছাইয়ে ২৪ জনের মধ্যে ১৭তম।

মেজবাহ আহমেদ : ১০০ মিটার স্প্রিন্টের প্রাক-বাছাইয়ে ১১.৩৪ সেকেন্ড সময় নিয়ে চতুর্থ। সব মিলিয়ে ২৪ জনের মধ্যে ১৪তম হয়ে বিদায়।

১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জলেসে বাংলাদেশের অভিষেক অলিম্পিক থেকে শুরু করে রিও ডি জেনেইরো- অভিজ্ঞতা সেই একই। প্রতিযোগীর নাম পাল্টেছে, কিন্তু পাল্টায়নি পারফরম্যান্স। সাইদুর রহমান ডন থেকে আজকের আবদুল্লাহ হেল বাকি- সেই তিমিরে থাকারই গল্প।

‘কিন্তু কেন?’ -এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়ার আগে বরং নিজেদের দিকে তাকাই। এর চেয়ে বেশি কিছু কি প্রাপ্য ছিল? এত প্রত্যাশা কেন আমাদের? ভুললে চলবে না, প্রতিটি অলিম্পিকেই আমাদের প্রতিযোগীদের অবলম্বন ছিল ওয়াইল্ড কার্ড। এক সিদ্দিকুর রহমান ছাড়া কেউ সাফল্যের মাপকাঠিতে সেই বিশ্ব মঞ্চে যেতে পারেননি।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দয়ায় ‘ভ্রমণে’র সেই সুযোগ পেয়েছেন আমাদের কর্মকর্তা আর অ্যাথলেটরা। যেখানে প্রতিযোগীদের চেয়ে কর্মকর্তাদের বহর থাকে দ্বিগুণের বেশি। এবার ১৯ সদস্যের বাংলাদেশ দলে মাত্র সাতজন প্রতিযোগী! রিওতে সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অলিম্পিক মিশনে গিয়েছিল বাংলাদেশ। যেখানে বিমান ভাড়া বাবদই খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা!

অবশ্য অলিম্পিকের মতো এমন বড় আসর শুরুর আগে ক্রীড়া কর্মকর্তাদের দৌড়াদৌড়ি বেড়ে যায়। ওপর মহলে লবিং চলে কে দলের সঙ্গে এই ‘আনন্দ ভ্রমণে’ যেতে পারবেন। সরকারি টাকায় বিদেশ সফর সঙ্গে ফিরতে ফ্লাইটে লাগেজ ভর্তি গিফট তো আছেই। এমন সুযোগের আশাতেই তো ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে ফেডারেশনগুলোতে ছুটে যান কর্তারা।

নির্ভেজাল সত্য হলো- অলিম্পিকের মতো বড় আসরে পদক জেতার সামর্থ্যটা নেই আমাদের প্রতিযোগীদের। আর সেই ব্যর্থতাটা কিন্তু সোনিয়া আক্তার কিংবা মাহফিজুর রহমান সাগরদের নয়। যেকোনো প্রতিযোগিতাতে সাফল্য পেতে চাই পরিকল্পনা। দীর্ঘমেয়াদি ছক কেবল সাফল্যের দরজা খুলে দেয়। এখানে রাতারাতি কিছু অর্জনের ফর্মুলা নেই। সঙ্গে চাই আধুনিক প্রযুক্তির অনুশীলন সরঞ্জাম। যার কোনোটাই নেই আমাদের।

অলিম্পিক শুরুর আগে পাশের দেশ ভারতের শ্যুটার অভিনব বিন্দ্রা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এবার ইলেকট্রনিক ম্যাগনেটিং প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে অনুশীলন করেছেন তিনি। যাতে গুলি ছোঁড়ার সময় নার্ভ স্থির থাকে। অথচ এমন প্রযুক্তি শুধু দূর থেকেই দেখেছেন আমাদের শুটাররা। আবদুল্লাহ হেল বাকিদের এমন সুযোগ তৈরি করে দিতে পারেননি কর্তারা। বিস্ময়কর তথ্য হলো- রিও অলিম্পিকে যাওয়ার যে সুযোগ মিলবে সেটা অনেকে নাকি সপ্তাহ দুয়েক আগেও জানতেন না!

ক্রীড়া সাংবাদিক, বিকেএসপির সাবেক শিক্ষার্থী, ফুটবলার রাশেদুল ইসলাম এ নিয়ে যেমনটা বলছিলেন পরিবর্তন ডটকমকে, ‘বাংলাদেশের সাতজন অলিম্পিয়ানের মধ্যে পাঁচজনকে এক পাশে রেখে দেশের দ্রুততম মানব মেজবাহ ও দ্রুততম মানবী শিরীনের প্রসঙ্গেই আসি। শুনে আশ্চর্য হবেন- অলিম্পিকের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার ১০ দিন আগে তারা জানতে পারলেন, ব্রাজিলে যাচ্ছেন। হাতে মোটে ১০ দিন। তখন তারা ব্রাজিলে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাবেন নাকি অনুশীলন করবেন? তাদেরকে অলিম্পিকে পাঠাতে পারছে বলে অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের খুশি দেখে মনে হচ্ছিল- পদক দিয়ে কী হবে, পেলের দেশে যাচ্ছি এটাই তো পদক জয়ের চেয়ে বেশি কিছু।’

আমাদের দেশের অ্যাথলেটরা অলিম্পিকে যাবার ১৫ দিন আগেও জানতে পারেন না, তিনি অলিম্পিকে যাচ্ছেন। অথচ আমাদের দেশে একমাত্র কর্তারাই দুই বছর আগে থেকে জানেন, তাদের মধ্যে কার অলিম্পিক ভ্রমণে যাওয়া নিশ্চিত।’

যে দেশে অলিম্পিকে কোচের বদলে কর্মকর্তাদের ‌’প্রমোদ ভ্রমণ’ নিশ্চিত হয়ে যায় সেখানে সাফল্য তো অনেক অনেক দূরের গল্প। আমাদের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো যেভাবে চলছে তাতে পদক দূরে থাক মূল পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগটাও হয়তো নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাবে না।

যেমনটা বলা হচ্ছিল- সবার আগে জেগে উঠতে হবে ফেডারেশনের কর্তা ব্যক্তিদের। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ছক আঁকতে হবে। প্রতিযোগীদের দিতে হবে আধুনিক সরঞ্জাম। দেশে বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলো নিয়মিত করতে হবে। স্বজনপ্রীতি দূরে রেখে সেরা প্রতিভাগুলো খুঁজে আনতে হবে সেই প্রান্তিক অঞ্চল থেকে। যাদের কাছ থেকে সাফল্য চাইছি- সবার আগে তাদের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাটাও দিতে হবে। তখনই কেবল আমরা ফেসবুক-টুইটারে বাকি-সাগরদের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠতে পারা মানায়! আর সেটা না পারলে এমন ব্যর্থতার অধ্যায়গুলো চার বছর পর পর সমৃদ্ধ হতে থাকবে।

তার আগে চলুন প্রত্যাশার লাগাম টেনে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ কসোভোর মেয়ে মালিন্দা কেলমেন্দিতেই বুঁদ হয়ে থাকি। কিংবা মেতে উঠি শরণার্থীদের অলিম্পিক অংশগ্রহণের স্বপ্নপূরণে। অন্যের বাড়ির উৎসব দেখেই চলুন তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থে আমাদের এতো প্রত্যাশা মানায় না!

আপন তারিক : সাংবাদিক

aapon_tariq@yahoo.com

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


*

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com